ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় নেপালের তরুণ প্রজন্মের (জেন জি) তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। সম্প্রতি কাঠমান্ডুর বস্তি উচ্ছেদ অভিযান এবং পার্কিং নিয়ে বিরোধের জেরে এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মহত্যার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে দেশটির যুবসমাজ।
রোববার (১২ জুলাই) রাজধানী কাঠমান্ডুর সিংহদরবার সচিবালয়ের বাইরে শত শত মানুষ সমবেত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে গরিবদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, মানবাধিকার রক্ষা, অবৈধ গ্রেফতার বন্ধ এবং বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়ের দাবি জানানো হয়।
অথচ গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের জেরেই নেপালের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছিল এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর তরুণদের বিপুল সমর্থনে ভর করে গত ২৭ মার্চ বালেন শাহের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) প্রতিনিধি সভায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।
প্রথাগত রাজনীতির বাইরে বালেন শাহকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিল তরুণরা। কিন্তু মাত্র ১০০ দিন পার হতেই সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
বর্তমান গণঅসন্তোষের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে নদী তীরবর্তী অবৈধ বস্তি উচ্ছেদে বালেন শাহের কঠোর সিদ্ধান্তকে। কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন সময় থেকেই এই উচ্ছেদ অভিযান তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কাঠমান্ডু উপত্যকার নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভূমিহীন পরিবার বসবাস করে। নেপালের আইন অনুযায়ী ভূমিহীনদের উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা বাধ্যতামূলক হলেও, উচ্ছেদ হওয়া ২৬০০ পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩২৫টি পরিবারকে অস্থায়ী আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
তদুপরি, গত ২ জুলাই সরকার বাকিদেরও আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ার নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। উচ্ছেদের প্রতিবাদ করায় পুলিশ বেশ কয়েকজন যুব অধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করেছে, যা নাগরিক সমাজকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের এই পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক এবং নাগরিক স্বাধীনতার লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে পার্কিং নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবকের আত্মাহুতির ঘটনা। কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট দপ্তরের সামনে পার্কিং জরিমানা নিয়ে মিউনিসিপ্যাল পুলিশের সাথে তর্কাতর্কির জেরে গণেশ নেপালি নামের ২৫ বছর বয়সি এক ‘পাঠাও’ চালক নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর গুরুতর দগ্ধ চালককে স্ট্রেচারের পরিবর্তে সাধারণ গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে প্রশাসনের সাথে নিহতের পরিবারের ৯ দফা চুক্তি এবং তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ কমেনি। বিরোধী দলগুলোও এই ঘটনায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে।
নির্বাচনের আগে বালেন শাহের প্রশাসন ১০০ দিনের মধ্যে সুশাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ১০০ দফার এক বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের মতে, ১০০ দিন পার হলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। উল্টো দুর্নীতি ও উচ্ছেদের নামে আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সরকারের বিরুদ্ধে।
একই সঙ্গে, নির্বাচিত হওয়ার পর বালেন শাহ নিজের নির্বাচনী এলাকায় যাননি এবং সংসদকেও এড়িয়ে চলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যে তরুণ প্রজন্ম বালেন শাহকে নেপালের নতুন আশার প্রতীক হিসেবে দেখছিল, আজ তারাই তার প্রশাসনের একনায়কতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে।


